Follow us

‘আদিবাসী বান্ধব’ বাজেট চায় সংখ্যালঘু ৫৪ নৃ-গোষ্ঠী

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2018-05-11
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বান্দরবানের সাঙ্গু নদীতে শামুক ও ঝিনুক কুড়াচ্ছেন এক আদিবাসী নারী। ১৯ এপ্রিল ২০১৬।
বান্দরবানের সাঙ্গু নদীতে শামুক ও ঝিনুক কুড়াচ্ছেন এক আদিবাসী নারী। ১৯ এপ্রিল ২০১৬।
শরীফ খিয়াম/বেনারনিউজ

প্রতি বছর জাতীয় বাজেটের আকার বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পায় না সমতল ও পাহাড়ের ৫৪টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশে আদিবাসী আছে প্রায় ১৬ লাখ, বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ৩০ লাখেরও বেশি।

আদিবাসীদের মানবাধিকার সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশনের পরামর্শক খোকন সুইটেন মুরমু গত মঙ্গলবার বেনারকে বলেন, “দেশে পাঁচবার আদমশুমারি হলেও আদিবাসীদের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তাই তাঁদের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়ন ব্যাহত হচ্ছে।”

আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ‘আদিবাসী বান্ধব’ করতে বেশ কিছু দাবি তুলেছে আরও একাধিক আদিবাসী সংগঠন। গত ৫ মে ঢাকায় ‘জাতীয় বাজেটে আদিবাসীদের জন্য সুনির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ চাই’ শীর্ষক প্রাক-বাজেট নাগরিক সভায় দাবিগুলো চূড়ান্ত করা হয়।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর প্রধান সংগঠন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং মঙ্গলবার বেনারকে বলেন, “আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের মাধ্যমে এসব দাবি অর্থমন্ত্রীকে জানানো হবে।”

আদিবাসী ফোরাম, আদিবাসী পরিষদ ও কাপেং ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ৬৫ শতাংশই দরিদ্র। এ ক্ষেত্রে চরম দারিদ্র্যের হার ৪৪ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদ ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “দেশের আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর আর্থসামাজিক উন্নয়নের ব্যাপারে রাষ্ট্রের অবশ্যই আরও যত্নশীল হওয়া উচিত।”

“মূলত অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে আগ্রহী হতে হবে,” যোগ করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এই অর্থ উপদেষ্টা।

প্রসঙ্গত, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোকে সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসার কথা জানিয়ে গত বছরের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “দেশের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি।”

খোকন সুইটেন মুরমু বেনারকে বলেন, “জাতীয় মাথাপিছু আয় এক হাজার ৭৫২ ডলার (এক লাখ ৪৫ হাজার ৪১৬ টাকা) হওয়ায় জাতিসংঘ আমাদের উন্নয়নশীল দেশ স্বীকৃতি দিলেও আদিবাসীদের আয়ের সাথে এর সামঞ্জস্য নেই।”

চলতি বছরের বাজেটে গড়ে প্রতি জনের জন্য বরাদ্দ যেখানে ২৫ হাজার ৬৯১ টাকা সেখানে পিছিয়ে পড়া বঞ্চিত একজন আদিবাসীর জন্য বার্ষিক বরাদ্দ মাত্র ১৫০ টাকা জানিয়ে সঞ্জীব দ্রং বলেন, “চরম দরিদ্রদের কাজ খুঁজে পাওয়ার সামর্থ্যও কম বিধায় তাঁদের অবস্থা খুবই করুণ।”

“আদিবাসীদের ব্যাপারে রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি, আইন ও চুক্তিগুলোর আঙ্গিকে বাজেট প্রণয়নের জন্য প্রতি বছরই দাবি জানানো হয়,” বলেন তিনি।

ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের অভিমত, “আদিবাসীরা যেহেতু সমতল ও পাহাড়ে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় আছে, সেহেতু তাঁদের দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতে এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া যেতে পারে।”

উল্লেখ্য, সাংবিধানিকভাবে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ হিসাবে স্বীকৃত পাহাড় ও সমতলের সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন থেকেই নিজেদের ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চাইছে। এই ইস্যুতে সরকারের অবস্থানের সঙ্গে তাঁরা একমত নয়।

অধিকার সুনিশ্চিত করার দাবি

“বাজেট বক্তৃতায় আদিবাসী বিষয়ক স্পষ্ট বিবরণী থাকতে হবে। তাঁদের অধিকার সুনিশ্চিত করতে সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে,” প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশগ্রহণকারী একাধিক নেতা বেনারকে বলেন।

সভায় চূড়ান্ত হওয়া দাবিনামায় বলা হয়েছে, “আদিবাসী উন্নয়নে খাত ও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে। একই সঙ্গে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বাজেটেও তাঁদের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখতে হবে।”

বরাদ্দের সুষ্ঠু বাস্তবায়নে আদিবাসীদের সম্পৃক্তকরণে নীতিমালা তৈরির দাবি জানিয়ে বলা হয়, “সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও ক্ষমতায়ন খাতে তাঁদের উপকারভোগ নিশ্চিত করতে নির্দেশনা থাকতে হবে।”

উচ্চ ও কারিগরি শিক্ষায় বৃত্তিসহ আদিবাসী নারী-তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বরাদ্দ রাখার দাবিও জানানো হয়েছে। সংযুক্ত হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিসহ আদিবাসী বিষয়ক সবগুলো আইন ও নীতিমালা বাস্তবায়নের দাবিও।

তবে অনেক আইনে ঝামেলা থাকার কথা বেনারকে জানান খোকন। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন-২০১০’এ ২৭টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ রয়েছে। কমপক্ষে আরও ২৭টি জাতির নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি।”

আগামী বাজেটে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমীগুলোর উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখারও দাবি জানিয়েছেন আদিবাসী নেতারা।

সমতলের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয়

বাজেট বরাদ্দ সাধারণত মন্ত্রণালয় ভিত্তিক হয় জানিয়ে সঞ্জীব দ্রং বলেন, “সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসীর বাস সমতলে হলেও তাঁদের দেখভালের জন্য কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ নেই। যে কারণে আমরা সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি জানিয়েছি।”

আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের সভাপতি ফজলে হোসেন বাদশার পরামর্শ, “সমতলে আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় না হওয়া অবধি তাঁদের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ে একটি বিশেষ সেল খোলা যেতে পারে।”

এ ব্যাপারে ড. আজিজুল বেনারকে বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কেই আদিবাসী বিষয়ক মন্ত্রণালয় হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।”

বর্তমানে সমতলের আদিবাসীদের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মাধ্যমে অর্থবণ্টনের যে প্রক্রিয়া চালু আছে তার সঙ্গে আদিবাসীদের সম্পৃক্ততা নেই দাবি করেন সঞ্জীব দ্রং ও খোকন সুইটেন মুরমু।

তাঁদের অভিমত,  “সহজ সরল আদিবাসীরা আমলাতন্ত্রের জটিলতার মধ্যে এর উপকার ভোগ করতে পারছে না। বরং অনেক ‘ভুয়া আদিবাসী’ আয়বর্ধনমূলক এই প্রকল্পের টাকা পেয়েছে।”

আদিবাসী সংগঠনগুলো বলছে, আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দকৃত প্রকল্পের মধ্যে পিছিয়ে পড়া অন্যান্য জনগণকেও বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রকৃত আদিবাসী উপকারভোগীর সংখ্যা খুবই কম।

সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি তথা ভিজিএফ, ভিজিডি, এফএফই, কাবিখা, কাবিটার মতো কর্মসূচিগুলোয় তাঁদের অন্তর্ভুক্তির পরিমাণ বেশি নয়। এসব ব্যাপারে সরকারের আরও মনোযোগী হওয়া উচিত বলে মত দেন অর্থনীতিবিদ ড. আজিজুল।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন