Follow us

সবচেয়ে বড় পোশাক শিল্প দুর্ঘটনার মামলা ঝুলে আছে চার বছর

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2017-04-24
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
চার বছর পূর্তিতে জুরাইন কবরস্থানে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় বিভিন্ন সংগঠন। এপ্রিল ২৪, ২০১৭।
চার বছর পূর্তিতে জুরাইন কবরস্থানে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় বিভিন্ন সংগঠন। এপ্রিল ২৪, ২০১৭।
নিউজরুম ফটো

চার বছর আগে বাংলাদেশের সাভারে রানা প্লাজা নামক একটি বহুতল ভবন ধসে ১ হাজার ১৩৬ জন পোশাক শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল। বিশ্বে পোশাক শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ওই দুর্ঘটনার বিচার এত দিনেও হয়নি। তিনটি পৃথক আইনে দায়ের হওয়া মামলাগুলো চলছে ঢিমেতালে।

সরকারি হিসেবে, ওই ঘটনায় আহত ও পঙ্গু হন ১ হাজার ১৬৭ জন, যাঁদের অধিকাংশই ছিলেন পোশাক শ্রমিক। এঁদের অনেকে এখনো দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। বেসরকারি সংস্থা ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, তাঁরা অর্থ সহায়তা পেলেও ক্ষতিপূরণ পাননি।

ওই ঘটনার পর ১০৩ শ্রমিকের লাশের পরিচয় পাওয়া যায়নি। এখনো প্রতীক্ষায় তাঁদের স্বজনেরা। বেওয়ারিশ হিসেবে তাঁদের মরদেহ দাফন করা হয়েছে ঢাকার জুরাইন কবরস্থানে।

এদিকে সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের ৪২ শতাংশের বেশি এখনো বেকার রয়েছেন।

২০১৩ সালের ২৪ মে সকালে ঢাকার অদূরে সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাছে রানা প্লাজা ধসে পড়ে। এ ঘটনায় ২৫ এপ্রিল সাভার থানায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে একটি এবং ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘন করায় আরেকটি মামলা হয়। এ ছাড়াও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ভবন নির্মাণের অভিযোগে আরেকটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন।

গার্মেন্টস শ্রমিক ও শিল্প রক্ষা জাতীয় মঞ্চের নেতা তপন সাহা বেনারকে বলেন, “দুর্ঘটনার পর চার বছর পার হলেও সরকার এখন পর্যন্ত দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারেনি। সরকার আন্তরিক হলে বিচার প্রক্রিয়া অনেক আগেই শেষ হতো।”

নিহতদের স্মরণে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় এতিম হওয়া শিশুদের নিয়ে প্রদীপ প্রজ্বলন অনুষ্ঠান আয়োজন করে গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন। এপ্রিল ২৪, ২০১৭।
নিহতদের স্মরণে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় এতিম হওয়া শিশুদের নিয়ে প্রদীপ প্রজ্বলন অনুষ্ঠান আয়োজন করে গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন। এপ্রিল ২৪, ২০১৭। নিউজরুম ফটো
হাইকোর্টের স্থগিতাদেশে ধীর গতি

এ পর্যন্ত চার বার তারিখ পড়লেও রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় করা হত্যা মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ এখনো শুরু হয়নি। ৪১ আসামির মধ্যে তিনজনের ক্ষেত্রে মামলার কার্যক্রমের ওপর হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ রয়েছে। ফলে মামলাটির বিচার কাজ সুষ্ঠুভাবে চলছে না।

হত্যা মামলার আসামিদের মধ্যে সোহেল রানা, রফিকুল ইসলাম ও সরোয়ার কামাল কারাগারে এবং ৩০ জন জামিনে আছেন। এদের মধ্যে এক আসামি আবু বকর সিদ্দিক মারা গেছেন এবং অপর সাতজন পলাতক।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, “হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকার কথা তাঁকে জানানো হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ এ বিষয়ে শিগগির প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।”

“এ ধরনের বিলম্বের কারণে আসামিরা সহজে খালাস পেয়ে যায়। পাঁচ থেকে সাত বছর পর সাক্ষী–প্রমাণ হাজির করে অভিযুক্তদের দোষী প্রমাণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে,” বেনারকে বলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক।

ইমারত আইনের মামলার হালচাল

ঢাকার মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে বিচারাধীন ইমারত নির্মাণ আইনে করা মামলাটির বিচার কাজ শুরু হয় গত বছরের ১৪ জুন।

আদালত সূত্র বলেছে, তিন পোশাক কারখানার তিন মালিক বজলুস সামাদ আদনান, আনিসুর রহমান ও আমিনুল ইসলাম অভিযোগ গঠনের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন করেছেন। এটি শুনানির অপেক্ষায়। তিন আসামি রিভিশন করায় মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

শুরু হয়নি দুদকের মামলা বিচার

দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে রানা প্লাজা নির্মাণের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলার বিচারকাজ এখনো শুরুই হয়নি। আদালত সূত্র বলেছে, ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে ১৯ এপ্রিল এ মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ হয়েছে। আগামী ৮ মে আদেশ দেবেন আদালত। এ মামলার আসামি সোহেল রানাসহ ১৮ জন।

আহত ৪২ শতাংশ শ্রমিক বেকার

গত শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘অবিস্মরণীয়, অমার্জনীয়: রানা প্লাজা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশনএইড জানায়, শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের প্রায় ৪২ দশমিক ২ শতাংশ এখনো বেকার রয়েছেন।

ওই দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে এক হাজার ৪০৩ জন শ্রমিকের ওপর জরিপ চালায় সংস্থাটি। গবেষণায় ৬০৭ জন মৃত শ্রমিকের পরিবারকেও নমুনা হিসেবে নেওয়া হয়।

প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে অ্যাকশনএইডের ব্যবস্থাপক নুজহাত জেবিন সাংবাদিকদের বলেন, “৫৭ শতাংশ আহত শ্রমিক বিভিন্ন চাকরি বা আত্মকর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন। এখনো বেকার ৪২ দশমিক ২ শতাংশ। আহত বেকার এই শ্রমিকদের মধ্যে ২৬ শতাংশ জীবিকার জন্য কোনো পরিকল্পনা করতে পারছেন না।

বিজিএমইএর অস্বীকার

অ্যাকশন এইডের এই গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অস্বীকার করেছে পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ।

এ তথ্য বিভ্রান্তিকর উল্লেখ করে সংগঠনটির সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বেনারকে বলেন, “আমি সম্পূর্ণভাবে এই প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি। কোনো আহত শ্রমিকের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ ধরনের একটি অভিযোগও আমরা পাইনি। যদি এমন একটি কেসও থাকে, আমাদের কাছে আনা হোক, ব্যবস্থা নেব।”

ওই দুর্ঘটনায় কারখানার মালিকদের কোনো অপরাধ নেই বলে সোমবার সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন তিনি।

তাঁর মতে, “রানা প্লাজা দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ভবনের মালিক সোহেল রানা। এ ছাড়া যারা ভবনের বাড়তি অংশ করতে অনুমোদন দিয়েছে বা করেছে, তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।”

ক্ষতিপূরণ না অর্থ সহায়তা

দুর্ঘটনায় একজন শ্রমিক নিহত হলে শ্রম আইন অনুযায়ী ১ লাখ, বিমা দাবি থেকে ২ লাখ এবং সরকারের তহবিল থেকে ৩ লাখ টাকা পান। তবে শ্রমিক নেতা ও বেসরকারি সংস্থাগুলো এটাকে ঠিক ক্ষতিপূরণ নয়, অর্থ সহায়তা দাবি করছেন।

ওই দুর্ঘটনায় আহত আশরাফুল ইসলাম সুজন (৩৪) বেনারকে বলেন, সরকারিভাবে ও বিভিন্ন সংগঠনের কাছ থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে ৭ লাখ টাকা পেয়েছেন। প্রথমে বিনা মূল্যে চিকিৎসা পেলেও এখন টাকা দিয়েই চিকিৎসা নিতে হয়। স্ত্রী, দুই সন্তান নিয়ে তার সংসার। একদিকে কাজ শুরু করতে পারছেন না, অন্যদিকে প্রায় সব টাকাই শেষ হয়ে গেছে।

বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বেনারকে বলেন, “আহত ও নিহত শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যদের চুঁইয়ে চুঁইয়ে সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি, যা দেওয়া হয়েছে তা আর্থিক সহযোগিতা।”

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বেনারকে বলেন, “দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিক ও নিহত শ্রমিকদের পরিবারের সবাই কমবেশি অনুদান পেয়েছে। আইনি সুরাহা না হওয়ায় এ বিষয়ে সরকার গঠিত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।”

উল্লেখ্য, ওই দুর্ঘটনার পর হাইকোর্টের নির্দেশে ক্ষতিপূরণের মাত্রা ও হার নির্ধারণে কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি প্রতিবেদন দিলেও হাইকোর্ট এ বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশ দেয়নি।

তবে ওই দুর্ঘটনার পর চাপের মুখে সরকার দ্রুততার সঙ্গে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন ৩ হাজার ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ৩০০ টাকা করে। শ্রম আইনে সংশোধনী এনে শ্রমিকদের কল্যাণে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন