Follow us

রানা প্লাজার বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের প্রায় অর্ধেক কাজ পাননি

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2018-04-23
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের মৃতদেহের সন্ধান চেয়ে ছবিসহ স্বজনদের অপেক্ষা। ২৫ এপ্রিল ২০১৩।
রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের মৃতদেহের সন্ধান চেয়ে ছবিসহ স্বজনদের অপেক্ষা। ২৫ এপ্রিল ২০১৩।
বেনারনিউজ

বিশ্বের ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা রানা প্লাজা ধস থেকে বেঁচে যাওয়া প্রায় অর্ধেক শ্রমিক এখনো কোনো কাজ পাননি এবং শতকরা ২১ ভাগ শ্রমিক দিনমজুরের পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশন এইডের এক গবেষণায় জানা গেছে।

ওই দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ২০০ শ্রমিকের ওপর করা গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ শ্রমিক এখনো কোনো কাজ করতে পারছেন না। শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় তাঁদের এই অবস্থা।

এর আগে ২০১৬ সালের এপ্রিলে রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘অবিস্মরণীয়, অমার্জনীয়: রানা প্লাজা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে অ্যাকশনএইড জানায়, শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের প্রায় ৪২ দশমিক ২ শতাংশ ছিলেন।

পাঁচ বছরের মাথায় এবারের গবেষণায় বলা হয়, দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া ২ হাজার ৪৩৮ জন শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ২১ দশমিক ৬ শতাংশ শ্রমিক পোশাক কারখানায় চাকরি পেয়েছেন।

তবে দুর্ঘটনার পর পাঁচ বছর পার হয়ে গেলেও যে ব্যক্তি জোর করে শ্রমিকদের ফাটল ধরা ভবনে ঢুকে কাজ করতে বাধ্য করেছিল ভবন মালিক সেই সোহেল রানার বিচার শেষ হয়নি।

শ্রমিক নেতারা রানা প্লাজা ভবন ধসকে দুর্ঘটনা না বলে এটিকে হত্যাকাণ্ড বলে অচিরেই সোহেল রানা ও তৈরি পোশাক ফ্যাক্টরির মালিকদের বিচার দাবি করেছেন।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৮ জন পোশাক শ্রমিক নিহত হন। আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ২,৪৩৮ জনকে। তাঁদের একটি বড় অংশ মানসিক সমস্যায় দিন কাটাচ্ছেন।

পাঁচ তলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন পাওয়া রানা প্লাজাকে নয় তলায় রূপান্তর করে সেখানে পাঁচটি পোশাক কারখানা ভাড়া দেওয়া হয়। সেখানে পাঁচ হাজারের মতো শ্রমিক কর্মরত ছিলেন৷

আদালত সূত্র জানায়, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় হত্যা ও ইমারত আইনে করা দুটি মামলায় অভিযোগ গঠন আটকে আছে। প্রায় দুই বছর আগে ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই অভিযোগ গঠন করা হলেও উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় সাক্ষ্য গ্রহণ হয়নি।

অ্যাকশন এইডের গবেষণা

গবেষণার ফলাফল তুলে ধরতে গিয়ে অ্যাকশন এইডের কমিউনিকেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-ব্যবস্থাপক শরীফুল ইসলাম বেনারকে বলেন, বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের শতকরা ৪৮ দশমিক সাত ভাগ কোনো কাজ পাননি। তাঁরা চরম কষ্টে রয়েছে।

তিনি বলেন, আবার জীবনের তাগিদে ২১ দশমিক ছয় ভাগ শ্রমিক বেছে নিয়েছেন দিনমজুরের কাজ। আরও ২১ দশমিক ছয় ভাগ শ্রমিক আবারও তৈরি পোশাক কারাখানায় কাজ পেয়েছেন।

জীবিত শ্রমিকদের মধ্যে ১২ শতাংশের শারীরিক অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর ২২ শতাংশ শ্রমিক এখনো মানসিকভাবে বিধ্বস্ত।

রানা প্লাজার দুর্ঘটনা হত্যাকাণ্ড: গোলটেবিল বৈঠক

রানা প্লাজা ধসের পাঁচ বছর সামনে রেখে সোমবার ডেইলি স্টার ভবনে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে ডেইলি স্টার পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক শাহেদুল আনাম খান বলেন, “যারা বেঁচে আছেন তাঁদের অনেকের সাথে আমার কথা হয়েছে। তাঁরা মনে করেন, যারা মারা গেছেন তারা বেঁচে গেছেন।”

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ ও ডেইলি স্টার যৌথভাবে ‘রানা প্লাজাধসের পাঁচ বছর: অভিজ্ঞতা, অর্জন ও করণীয়’ শীর্ষক এই গোলটেবিল অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

রানা প্লাজার আট তলায় অবস্থিত নিউওয়ে স্টাইল লিমিটেডের কোয়ালিটি স্পেশালিস্ট মাহমুদুল হাসান হৃদয় সেদিন বেঁচে যান। হৃদয়ের বুকের পাঁজর ভেতর দিকে ঢুকে গেছে। মেরুদণ্ডে ফাটল রয়েছে। তাঁর ডান পা অবশ হয়ে গেছে।

“আমি কয়েকটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমাকে বের করে দিয়েছে,” বেনারকে বলেন হৃদয়।

তিনি বলেন, ডাক্তাররা বলেছেন তিনি আজীবন পঙ্গু হয়ে বসবাস করবেন।

বেঁচে যাওয়া আরেক শ্রমিক আল-আমিন ঢাকার মিরপুর এলাকায় দিনমজুরের কাজের জন্য বসে থাকেন।

“কী করব? চাকরি পাই না। আবার কোনো বিল্ডিংয়ে ঢুকলে মনে হয় ছাদ ভেঙে পড়বে। আমি ছাদের নিচে ঘুমাতে পারি না,” বেনারকে বলেন আমিন।

শ্রমিক নেতা ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নজরুল ইসলাম খান বেনারকে বলেন, “রানা প্লাজা দুর্ঘটনাকে আমরা দুর্ঘটনা বলি না। এটি একটি হত্যাকাণ্ড।”

তিনি বলেন, ঘটনার আগের দিন রানা প্লাজার গায়ে ফাটল দেখা দেয়। শ্রমিকেরা বের হয়ে আসে। পরের দিন শ্রমিকদের সেই ভবনে ঢুকে কাজ করতে বাধ্য করে সোহেল রানা ও মালিক পক্ষের লোকেরা।

আর তার কিছুক্ষণ পরই ভবন ধসে পড়ে, বলেন নজরুল ইসলাম খান।

শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ স্কপের যুগ্ম সমন্বয়কারী নইমুল আহসান জুয়েল বেনারকে বলেন, সেদিন শ্রমিকদের যখন জোর করে ফাটল ধরা ভবনে প্রবেশ করানো হচ্ছিল তখন তাঁদের পক্ষে কথা বলার কেউ ছিল না।

“যদি সেখানে ট্রেড ইউনিয়ন থাকত তাহলে তাঁদের কেউ ভবনের ভেতরে নিতে পারত না। আর এতগুলো মানুষের প্রাণহানি হতো না। তাই আমাদের দাবি, সকল শিল্প কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করতে দিতে হবে,” তিনি বলেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য রায় রমেশ বলেন, সরকারি দপ্তরের দুর্নীতির কারণে রানা প্লাজা ধসে পড়েছে। তিনি বলেন, এমন দুর্বল ভবনকে ফায়ার সার্ভিস বিভাগ থেকে এ-ক্যাটাগরি ভবন হিসেবে সনদ দেওয়া হয়।

তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সহসভাপতি মোহাম্মাদ নাছির ডেইলি স্টারের গোলটেবিলে বলেন, রানা প্লাজার কারণে সারা বিশ্বে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক না কেনার জন্য মানববন্ধন হয়েছে।

তবে অ্যালায়েন্স ও অ্যাকোর্ডের কারণে, আমরা আমাদের প্রায় সব ফ্যাক্টরিগুলোর কর্ম পরিবেশ নিরাপদ করতে পেরেছি। বাংলাদেশ এখন কর্মপরিবেশ নিরাপদ করার ক্ষেত্রে বিশ্বে একটি রোল মডেল।

তিনি বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর ১২’শ ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁর মতে বর্তমানে তিন হাজার নয়শোর মতো তৈরি পোশাক কারখানা শ্রমিকদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ।

তাঁর সাথে একমত পোষণ করে আইএলও ঢাকা অফিসের ইন-চার্জ গগন রাজ ভান্ডারি গোল টেবিলে বলেন, পাঁচ বছর আগে বাংলাদেশের খুব কম ফ্যাক্টরিতে অগ্নি-প্রতিরোধ দরজা ছিল।

“এখন এ রকম দরজা প্রায় সব ফ্যাক্টরিতে আছে। তবে কারখানাগুলোর সামনে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে,” তিনি বলেন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন