Follow us

বন্যার পর দাদনের ফাঁদে হাওরের মানুষ

পুলক ঘটক
ঢাকা
2017-05-08
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
শাল্লা উপজেলা সদরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এপ্রিল ৩০, ২০১৭।
শাল্লা উপজেলা সদরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এপ্রিল ৩০, ২০১৭।
নিউজরুম ফটো

আগাম বন্যায় জীবিকা ও ফসল হারানোর পর বেসরকারি সংস্থা—এনজিও ও মহাজনী দেনায় হাবুডুবু খাচ্ছে হাওর অঞ্চলের মানুষ। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষক ও জেলেদের সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছে সরকার।

ইতিমধ্যে ব্যাংকগুলো ঋণ আদায় স্থগিত করেছে। এনজিওগুলোকেও এক বছর কিস্তি আদায় বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

হাওর এলাকায় বছরে একটা মৌসুমেই আবাদ করা যায়। বোরোর সেই আবাদ পুরোপুরি তলিয়ে গেছে। আগামী ছয় মাস হাওর ভূমির পুরোটাই পানির নিচে ডুবে থাকবে। ফলে কৃষকের হাতে কোনো কাজ নেই। এই অবস্থায় মহাজনের ঋণ মেটানোর কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরী উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের ইয়াসমিন বেগম এবং রোহিসা বেগম ব্র্যাকে থেকে এবং চানপুর গ্রামের বাসন্তী রাণী দাস ঋণ নিয়েছেন গ্রামীণ ব্যাংক থেকে। পরপর তিন কিস্তি ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি জানিয়ে রোহিসা বেনারকে জানান “এখন খাব কী আর কিস্তি দেবো কী? ধান উঠলে ঋণ শোধ করতে অসুবিধা হতো না।”

কৃষ্ণপুর গ্রামের ইসমাইল মিয়া ৩০ শতাংশ সুদে মহাজন থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। তিনি বেনারকে জানান, “হাওরের পুরুষেরা এলাকা ছেড়ে কাজের সন্ধানে ঢাকায় ও অন্যান্য জেলায় চলে গেছে। আমিও ঢাকায় গিয়ে রিকশা চালাব।”

হাওর এলাকার অধিবাসী খ্যাতিমান তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তফা জব্বার বেনারের কাছে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, “দাদন ব্যবসায়ীরা তাদের লগ্নির কয়েকগুণ বেশি আদায় করে। এই মুহূর্তে সেখানে হস্তক্ষেপ দরকার। অন্তত সুদ মওকুফে তাদের বাধ্য করা দরকার।”

হাওর গবেষক মুজিবুর রহমান চৌধুরী বেনারকে বলেছেন, “এগুলো বেআইনি অর্থলগ্নি। মানুষ এর ওপরই নির্ভর করে।”

তিনি বলেন, “সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ব্যাংকগুলো ঋণ আদায় স্থগিত করলেও এনজিওগুলো এখনো ঘোষণা দেয়নি। হাওরবাসীরা ব্যাংকের তুলনায় অনেক গুণ বেশি ঋণ এনজিও থেকেই নেয়।”

মাছ পাচ্ছে না জেলেরা

বন্যায় আবাদ নষ্ট হলেও এ সময় জেলেদের জালে বেশি মাছ ধরা পড়ে। অথচ বন্যায় এবার জেলেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পানিদূষণে প্রায় ১ হাজার ২৭৬ টন মাছ মারা যাওয়ার তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে সরকার বলছে, এই ক্ষতি ২১৪ মেট্রিক টনের বেশি হবে না। ফলে জেলেরা কর্মহীন হয়ে পড়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষকদের পাশাপাশি ৫০ হাজার জেলেকে ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

বৃহস্পতিবার হাওর পরিস্থিতি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটির সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বেনারকে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া।

জেলেদের কর্মহীন হয়ে পড়ার তথ্য স্বীকার করে বেনারকে তিনি বলেন, “জেলা ভেদে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা ইতিমধ্যে ছাড় করা হয়েছে। ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে ৪০ দিনের কর্মসূচি প্রকল্পের আওতায় এ কর্মসংস্থান করা হবে।”

তিনি বলেন, “প্রাথমিকভাবে হাওর অঞ্চলের ৩ লাখ ৩০ হাজার প্রান্তিক দরিদ্র লোককে ভিজিএফ সহায়তা দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি সুলভ মূল্য ও খোলাবাজার চাল বিক্রয় কার্যক্রম চলমান থাকবে।”

গত ৩০ এপ্রিল হাওর এলাকায় গিয়ে ঋণের কিস্তি আদায় বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে বলেছেন তিনি।

ক্ষতির পরিধি

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হাওর পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সভায় সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষয়ক্ষতির সর্বশেষ চিত্র তুলে ধরা হয়। এই হিসাবের সঙ্গে মিলছে না বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রদত্ত হিসাব।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে হাওরভুক্ত ছয়টি জেলায় চাল উৎপাদনে মোট ক্ষতি দেখানো হয়েছে ৭ লাখ ৪৯ হাজার ৫৮০ মেট্রিক টন। অন্তত: ২ লাখ ৪৯ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমির বোরো ধান সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চালের উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জে; ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৮৫৫ মেট্রিক টন। দ্বিতীয় অবস্থানে কিশোরগঞ্জ, যেখানে ১ লাখ ৪৭ হাজার মেট্রিকটন চাল উৎপাদন সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে অনুযায়ী, হাওর অঞ্চলের ৪৬ টি জলাশয়ের মোট ২১৩.৯৫ মেট্রিক টন মৎস্য সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নেত্রকোনা জেলায় ১১৮.৮২ মেট্রিক টন। সুনামগঞ্জে ক্ষতি হয়েছে ৪৯.৭৫ মেট্রিক টন, মৌলভীবাজারে ২৫ মেট্রিক টন এবং সিলেটে ২১ মেট্রিক টন মাছ মারা গেছে।

এর আগে সরকার জানায়, এবারের বন্যায় হাওরের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৪ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। শস্য ক্ষতির পরিমাণ ৪ হাজার ৩৯১ কোটি ২৬ লাখ টাকা, মাছের ক্ষতি ১৯ কোটি ৪২ লাখ টাকার এবং খড়ের ক্ষতির পরিমাণ ১১৩ কোটি ৫ লাখ টাকার।

সরকারি এই হিসাবের বিপরীতে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এর দ্বিগুণ বলে হাওরবাসীর ধারণা।

নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে হাওরের অধিবাসী ফারুক তালুকদার বেনারকে বলেন, “এবার হাওরে আগাম বন্যা এসেছে। ডুবন্ত ফসল ঘরে তোলাতো সম্ভব হয়ইনি, গরু বাছুরের জন্য খড়ও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।”

বেসরকারি সংগঠন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা’র মাঠ জরিপ অনুযায়ী সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ ১৩ হাজার কোটি টাকা।

কেমন সহায়তা দরকার?

হাওর এলাকার মানুষকে বাঁচাতে গেলে জলমহালগুলো সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া দরকার বলে মনে করেন মোস্তফা জব্বার।

তিনি বলেন, “বিকল্প কর্ম সংস্থান তৈরির সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে বিলে মাছ ধরার সুযোগ করে দেওয়া।”

একই পরামর্শ দিয়েছে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা এবং হাওর অ্যাডভোকেসি প্লাটফরমসহ বিভিন্ন সংগঠন।

তবে আইনগত জটিলতার কারণে এটা সম্ভব হবে না বলে বেনারকে জানিয়েছেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব মেজবাউল আলম।

“যারা লিজ নিয়েছেন সেখানে তাদের বিনিয়োগ আছে। এখন যদি ইজারা বাতিল করা হয় তাহলে তারা আদালতে যাবে। তখন নতুন জটিলতা তৈরি হবে,” বলে তিনি জানান।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি সুদমুক্ত ঋণ, গবাদিপশুর খাদ্য, শতভাগ ছাত্র বৃত্তি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খাবার সরবরাহের পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্টজন ও সংগঠনগুলো। অনিয়ম রোধের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার সরকারি নগদ টাকা মোবাইল ব্যাংকিং পদ্ধতিতে প্রদানের পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন