Follow us

ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে শিশুসহ অন্তত ছয় জনের মৃত্যু

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2017-05-30
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার জালিয়াপাড়া এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা। মে ৩০, ২০১৭।
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার জালিয়াপাড়া এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা। মে ৩০, ২০১৭।
আবদুর রহমান/বেনারনিউজ

আপডেটঃ ৩০ মে ২০১৭, ইস্টার্ন টাইম দুপুর ০২.০০

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’য় বাংলাদেশে শিশুসহ অন্তত ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েক হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কক্সবাজার ও রাঙামাটিতে ঝড়ে ছয় জন এবং ভোলায় আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে বৃষ্টির মধ্যে অসুস্থ এক শিশু মারা যাবার সংবাদ পাওয়া গেছে। তবে দিন শেষে ঘূর্ণিঝড়টি দুর্বল হয়ে নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড়টি বাংলাদেশে প্রবেশের পূর্বে শ্রীলঙ্কায় দুই শতাধিক প্রাণহানি ঘটালেও সরকারের প্রস্তুতি ও জনসচেতনতার ফলে ব্যাপক প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. শহীদুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে আগের তুলনায় আবহাওয়ার পূর্বাভাস সহজে জানা যায়। আর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারায় ভয়াবহ হলেও ঘূর্ণিঝড়টি কম ক্ষতি করতে পেরেছে।”

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব গোলাম মোস্তফা বেনারকে বলেন, “ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ মোকাবিলায় সরকার সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছিল। এ কারণে বড় কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি দেশ।”

গত ২৬ মে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া একটি লঘুচাপ ২৮ মে সকালে নিম্নচাপে এবং মধ্যরাতে ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেয়। সোমবার সন্ধ্যায় সেটি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। মঙ্গলবার সকাল থেকে ঘূর্ণিঝড়টি বাংলাদেশের কক্সবাজার-চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করতে শুরু করে।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাগর তীরের আটটি দেশের আবহাওয়া দপ্তর ও বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্যানেলের তালিকার ক্রম অনুসারে ঘূর্ণিঝড়টির নামকরণ করা হয় ‘মোরা’।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেয়ে আগে থেকেই দেশের চারটি সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় সরকার। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরের জন্য ১০ নম্বর ও মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৮ নম্বর মহা বিপৎসংকেত দেখাতে বলা হয়।

প্রসঙ্গত, ১০ নম্বর মহা বিপৎসংকেতের অর্থ হলো-সংশ্লিষ্ট বন্দর সর্বোচ্চ তীব্রতার এক সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের কবলে নিপতিত। যেখানে ঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৯ কিলোমিটার বা তার বেশি।

তবে মঙ্গলবার দুপুরের পর ঘূর্ণিঝড়টি দুর্বল হয়ে পড়ায় দেশের সকল স্থানে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

ছয় জনের মৃত্যু

কক্সবাজারে ঘূর্ণিঝড়ে গাছচাপায় চারজন নিহত হয়েছেন বলে বেনারকে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক আলী হোসেন। নিহতরা হলেন চকরিয়া উপজেলার ভেউলা মানিকচর এলাকার সায়েরা খাতুন (৬৫), একই উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের রহমত উল্লাহ (৪৫), কক্সবাজার সদর উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের শাহিনা আক্তার (১০) ও পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া এলাকার আবদুল হাকিম (৫০)।

“এ ছাড়া এ জেলায় আর কোনো নিহতের খবর পাওয়া যায়নি। আহত হয়েছেন প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। ঘূর্ণিঝড়ে বেশ কিছু কাঁচা বাড়িঘর ও জলোচ্ছ্বাসে কিছু রাস্তাঘাট ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে,” জানান তিনি।

এদিকে মঙ্গলবার ঝড়ের সময় রাঙামাটি শহরে গাছচাপায় এক নারী ও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে বেনারকে নিশ্চিত করেছেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মো. মানজারুল মান্নান।

রাঙামাটিতে নিহতরা হলেন শহরের আসাম বস্তি এলাকার হাজেরা খাতুন (৪৫) ও মসলিনপাড়ার নাসিমা আক্তার (১৩)। এছাড়া রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু ঘরবাড়ি এবং গাছপালা ভেঙে পড়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।

ঘূর্ণিঝড় মোরার ছোবলে রাঙামাটিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত। মে ৩০, ২০১৭। [নিউজরুম ফটো]
ঘূর্ণিঝড় মোরার ছোবলে রাঙামাটিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত। মে ৩০, ২০১৭। নিউজরুম ফটো
এদিকে গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ভোলার মনপুরার কলাতলী চরে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার সময় মায়ের কোলে থাকা এক বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

মনপুরার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আমানুল্লাহ আলমগীর জানান, সোমবার রাত ১টার দিকে আশ্রয়কেন্দ্রের পথে প্রচণ্ড বৃষ্টি ও ঠাণ্ডা বাতাসে এক মায়ের কোলে থাকা তাঁর শিশুটি মারা যায়। তবে শিশুটি আগে থেকেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল।

দুর্বল হয়ে নিম্নচাপে পরিণত

মঙ্গলবার সকাল ছয়টার দিকে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি গতির বাতাস নিয়ে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করে দুর্বল হয়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড় মোরা। বর্তমানে এটি স্থল গভীর নিম্নচাপ আকারে রাঙামাটি ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। ঘূর্ণিঝড় মোরা উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে বৃষ্টি ঝরিয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

মঙ্গলবার দুপুরে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১৭ নম্বর বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা এবং সমুদ্র বন্দরগুলোর ওপর দিয়ে ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।

উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে মঙ্গলবার রাত ৯টা পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে পরবর্তীতে সাবধানে চলাচল করতে বলেছে আবাহাওয়া অধিদপ্তর।

এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক শামছুদ্দীন আহমেদ বেনারকে বলেন, “এটি একটি বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় হওয়ায় এটি দুর্বল হতে আরো বৃষ্টি ঝরবে।”

উদ্বিগ্ন প্রধানমন্ত্রীর সার্বক্ষণিক তদারকি

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ৬০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক সম্মেলনে যোগ দিতে অস্ট্রিয়া রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই দুর্যোগ মুহূর্তে দেশে না থাকলেও সেখান থেকেই ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র বিষয়ে খোঁজ রাখা ও তদারকি করছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিমকে উদ্ধৃত করে বাসস জানায়, ঢাকার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় প্রশাসনকে সর্বাত্মক প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

আশ্রয় কেন্দ্রে ৪ লাখ ৬৮ হাজার

এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব গোলাম মোস্তফা জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় মোরা আক্রান্ত এলাকার চার লাখ ৬৮ হাজার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় মোরা’র পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য দেন। তবে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসায় অনেকে এখন আশ্রয়কেন্দ্র থেকে চলে গেছেন বলে জানান গোলাম মোস্তফা।

তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোরা উপদ্রুত এলাকার মানুষদের জন্য এক হাজার চারশ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে।

তাৎক্ষণিকভাবে এক কোটি ৪৬ লাখ টাকা দেওয়ার কথা উল্লেখ করে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে সে অনুযায়ী সেটা পূরণের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি।

কক্সবাজারে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, ঘূর্ণিঝড় মোরা’র আঘাতে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ২০ হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, “ঘূর্ণিঝড় মোরার ক্ষতি পোষাতে সরকার তৎপর রয়েছে। দুর্গত এলাকার মানুষের জন্য এক কোটি ৮৭ লাখ টাকা জরুরি ভিত্তিতে পৌঁছানো হয়েছে।”

ক্ষয় ক্ষতির বিষয়ে কক্সবাজার জেলার সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নূর আহম্মদ বেনারকে বলেন, “ক্ষয়ক্ষতির পুরো হিসাব এখনো পাইনি। তবে যা দেখছি তাতে মনে হচ্ছে কমপক্ষে ৭০ ভাগ কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। অসংখ্য গাছপালা ভেঙে গেছে।”

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কক্সবাজার থেকে আবদুর রহমান

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন