Follow us

উপজেলা চেয়ারম্যানের শেষকৃত্যে যাবার পথে গুলিতে নিহত পাঁচ জন

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2018-05-04
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
রাঙ্গামাটির বেতছড়ি এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে পাঁচজন নিহত হবার স্থান থেকে আলামত সংগ্রহ করছেন পুলিশ ও সেনা সদস্যরা। ৪ মে ২০১৮।
রাঙ্গামাটির বেতছড়ি এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে পাঁচজন নিহত হবার স্থান থেকে আলামত সংগ্রহ করছেন পুলিশ ও সেনা সদস্যরা। ৪ মে ২০১৮।
বেনারনিউজ

আপডেট: ৪ মে, ইস্টার্ন টাইম  দুপুর ০২.৪

রাঙ্গামাটিতে গুলিতে নিহত উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে শুক্রবার সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছেন পাঁচ জন। জনপ্রতিনিধিকে হত্যার পরদিনই তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের হত্যার এই ঘটনায় রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল রাতেই শুরু হয়েছে পুলিশের বিশেষ অভিযান।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ নিয়ে গত সাড়ে পাঁচ মাসে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে খুন হয়েছেন ১৭ জন। পূর্বাপর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে মৃত্যুর এই মিছিল বড় হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় রাজনীতিবিদেরা।

নিহত ১৭ জনের সবাই পাহাড়ে প্রতিনিধিত্বশীল আঞ্চলিক তিনটি সংগঠন—ইউপিডিএফ, জেএসএস (এম এন লারমা) এবং ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর নেতা-কর্মী।

সর্বশেষ নানিয়ারচর উপজেলার বেতছড়ি এলাকায় শুক্রবার দুপুরে পাঁচ খুনের ঘটনায় পাহাড়ে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বন্ধ হয়ে গেছে ওই এলাকার যান চলাচল।

রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আলমগীর কবীর বেনারকে বলেন, “দুর্বৃত্তরা ‘ব্রাশফায়ার’ শুরু করলে ঘটনাস্থলেই চার জন মারা যান, আহত হন নয় জন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়।”

স্থানীয় একাধিক সূত্র বেনারকে জানায়, বৃহস্পতিবার গুলিতে নিহত রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সংস্কারপন্থী (এমএন লারমা) গ্রুপের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমার শেষকৃত্যে যোগদানের জন্য নিহতরা মাইক্রোবাসে করে খাগড়াছড়ি থেকে নানিয়ারচর যাচ্ছিলেন।

তাঁদের গাড়িটি বেতছড়ি এলাকার কেংক্রাছড়ি নামক স্থানে পৌঁছলে গুলি শুরু করে সেখানে আগে থেকে অবস্থান করা সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা।

এসপি আলমগীর বলেন, “পারিবারিক শ্মশানে (কুত্তামারা গ্রামে) দুপুর বারোটায় শুরু হওয়া শক্তিমানের দাহক্রিয়া চলাকালেই এ ঘটনা ঘটে।”

“জড়িতদের গ্রেপ্তারে চিরুনি অভিযান শুরু হয়েছে,” যোগ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

গতকাল নিহতরা হলেন; ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিকের প্রধান তপনজ্যোতি চাকমা বর্মা, যুব সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য তনয় চাকমা, খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলা যুব সমিতির সভাপতি সুজন চাকমা, সেতু লাল চাকমা ও মাইক্রোবাস চালক মো. সজিব।

পার্বত্য রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একাধিক সূত্রের মতে, পাহাড়ের রাজনীতি হঠাৎ পাল্টে যায় গত বছরের ১৫ নভেম্বর। সেদিন খাগড়াছড়িতে সংবাদ সম্মেলন করে ইউপিডিএফ ভেঙে কিছু নেতা-কর্মী ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) গঠন করেন। এরপর থেকেই কর্তৃত্ব ধরে রাখা নিয়ে একের পর এক খুনোখুনি হচ্ছে।

অভিযুক্ত ইউপিডিএফ

ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিকের লিটন চাকমা সাংবাদিকদের বলেন, “শক্তিমান চাকমাকে হত্যার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তপনজ্যোতি চাকমা বর্মাকে করে হত্যা করে পাহাড়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে ইউপিডিএফ।”

তবে ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমা বেনারকে বলেন, “পার্বত্য এলাকায় প্রতিপক্ষের ওপর দায় চাপিয়ে দেয়া একটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে, এটা খুবই বাজে প্রবণতা।”

“এর ফলে মূল হত্যাকারীরা আড়ালেই থেকে যায়,” উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, “তারা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আমাদের দোষারোপ করছে।”

মাইকেল চাকমা দাবি করেন, “আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি আজও (শুক্রবার) রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সামনেই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। মূলত তাঁরাই পার্বত্য এলাকায় অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে চাইছে।”

সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন আদি জেএসএস’র কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার বিভাগের সদস্য দীপায়ন খীসারও অভিমত, “এই ঘটনার সাথে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সম্পর্ক আছে।”

“যেখানে একজনকে গুলি করে মারা হয়েছে, সেখানে আজ নিরাপত্তা আরো জোরদার থাকার কথা। কিন্তু আবারও দিন দুপুরে মানুষ মারা যাচ্ছে, তাও আবার প্রধান সড়কে,” যোগ করেন তিনি।

কে এই তপন ওরফে বর্মা

মাইকেল বেনারকে বলেন, “তপন একদম শুরু থেকে ২০১৩ সাল অবধি আমাদের পার্টিতে ছিল।” শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পথে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকায় একটি কনফারেন্সের মাধ্যমে ইউপিডিএফ প্রতিষ্ঠিত হয়।

শুরু থেকে এটির নেতৃত্বে আছেন প্রসীত বিকাশ খীসা। তারা একাধিক সাধারণ নির্বাচনেও অংশ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠার ১৯ বছর পর দলটি প্রথমবারের মতো বিভক্ত হয়। দলত্যাগ করা নেতারা ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক নামে নতুন সংগঠন গড়ে তোলে।

“এদের কেউ কেউ দল থেকে বহিস্কৃত ছিলেন। আবার অনেকে অভিযুক্ত হওয়ার পর স্বেচ্ছায় চলে গেছেন,” বলেন মাইকেল।

ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশের পর আহ্বায়ক তপন বর্মা অভিযোগ করেন, “পার্বত্য এলাকায় পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে দলটি (ইউপিডিএফ) গড়ে উঠলেও বর্তমানে সম্পূর্ণ আর্দশচ্যুত হয়েছে।”

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা বেনারকে বলেন, “তিনি (তপন) মূলত ইউপিডিএফ’র সামরিক উইংয়ে কাজ করতেন।”

পার্বত্য এলাকা জুড়ে আতঙ্ক

আলোচ্য হত্যাকাণ্ড দুটির পর কমপক্ষে নয় লাখ পাহাড়ি আতঙ্কে আছেন জানিয়ে দীপায়ন বেনারকে বলেন, “খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে আতঙ্কটা বেশি।”

তিনি জানান, পার্বত্য এলাকার গহীন অরণ্যে মিয়ানমারের আরাকান ন্যাশনাল এলায়েন্স (এআরএন), আরাকান লিবারেশন পার্টি (এলপি), আরাকান সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (উলফা) সক্রিয় রয়েছে।

“নাইক্ষ্যংছড়ি, থানচিসহ সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় এরা অনেক শক্তিশালী,” বলেন জেএসএসের (সন্তু লারমা) এই নেতা।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দুই দশকের সশস্ত্র লড়াই শেষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি চুক্তি করে সরকারের সঙ্গে। তখন পর্যন্ত পাহাড়ে এই একটি দল ছিল।

পরে চুক্তির বিরোধিতা করে জনসংহতি সমিতির ছাত্রসংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের বড় একটি অংশ মূল দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে গঠন করে ইউপিডিএফ, এর নেতৃত্বে প্রসিত বিকাশ খীসা। দলটি গঠনের পরই জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

২০০৩ সালে ইউপিডিএফ থেকে প্রথমবারের মতো কয়েকজন নেতা দলত্যাগ করলেও তাঁরা নতুন দল করেননি। এ ঘটনার প্রায় ১৪ বছর পর (গত বছরের ১৫ নভেম্বর) অনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায় ইউপিডিএফ।

গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ নামে নতুন দলের আহ্বায়ক হন তপন জ্যোতি চাকমা। তিনিসহ গতকাল সন্ত্রাসীদের হামলায় পাঁচজন প্রাণ হারালেন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন