Follow us

করোনাভাইরাস মোকাবেলা: বাড়ছে স্বাস্থ্যকর্মী, দৈনিক পরীক্ষা হবে এক লাখ নমুনা

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-06-22
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে রাজধানীর বেশি আক্রান্ত জনসংখ্যার কিছু এলাকা ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় নাগরিকদের প্রবেশ ও বের হওয়া নিষেধ। ছবিটি ঢাকার পূর্ব রাজাবাজার থেকে তোলা। ২২ জুন ২০২০।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে রাজধানীর বেশি আক্রান্ত জনসংখ্যার কিছু এলাকা ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় নাগরিকদের প্রবেশ ও বের হওয়া নিষেধ। ছবিটি ঢাকার পূর্ব রাজাবাজার থেকে তোলা। ২২ জুন ২০২০।
[ফোকাস বাংলা]

টানা সমালোচনার মুখে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস পরীক্ষার সংখ্যা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে দেশে প্রতিদিন এক লাখ পর্যন্ত পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এই তথ্য জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বেনারকে বলেন, এই পরীক্ষার জন্য আরও প্রায় তিন হাজার স্বাস্থ্যকর্মী দ্রুত নিয়োগ দেয়া হবে।

এদিকে দেশে করোনাভাইরাস রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় সোমবার আরও দুই হাজার ডাক্তার নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

দুই সপ্তাহের বাংলাদেশ সফর শেষে চীনা করোনাভাইরাস বিশেষজ্ঞ দল রোববার সাংবাদিকদের জানায়, বাংলাদেশে কবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠবে, তা বলা যাচ্ছে না। তা ছাড়া, জনসংখ্যার তুলনায় পরীক্ষার সংখ্যা অনেক কম বলে উল্লেখ করেছে দলটি।

সোমবার ১০ সদস্যের চীনা প্রতিনিধি দলটি ঢাকা ছেড়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বিমানবন্দরে চীনা দলকে বিদায় জানান।

বিমানবন্দরে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, “চীনা বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে করোনাভাইরাস চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তবে তাদের মতে অনেক জায়গায় উন্নতির সুযোগ আছে।”

মন্ত্রী আরও বলেন, “করোনাভাইরাসে আক্রান্তের হার এভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকলে আরও দুই হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হবে। পাশাপাশি, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের কাজও চলমান রয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী সরকার বুঝেশুনে পদক্ষেপ নেবে।”

এর আগে রোববার সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে চীনা প্রতিনিধি দলের সদস্যরা ঢাকার বাইরে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করার তেমন বড় আয়োজন না থাকার বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস পরীক্ষা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন।

তাঁরা বলেন, বাংলাদেশে সঠিকভাবে লকডাউন পালন না করায় সংক্রমণ বাড়ছে এবং তা কবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাবে, তা বলা যাচ্ছে না। কারণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছার পর সংক্রমণ কমতে শুরু করবে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব অধ্যাপক মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বেনারকে বলেন, “দেখুন চীনা বিশেষজ্ঞরা যা দেখেছেন, তাই বলেছেন। তাঁরা আমাদের অবস্থা দেখে হতাশা প্রকাশ করেছেন।”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সর্বোচ্চ পর্যায় কখন পৌঁছবে, সেব্যাপারে তাঁরা কোনো ধারণা দিতে পারেননি। কারণ আমাদের দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, কর্মহীনতা।”

“চীনা বিশেষজ্ঞদল যা বলেছে, আমি বলব তা এক ধরনের লজ্জার বিষয়,” মন্তব্য করে ডা. ইহতেশামুল হক বলেন, “বাংলাদেশে কবে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সর্বোচ্চ পর্যায় আসবে সে ব্যাপারে গবেষণা করে বলার দায়িত্ব রোগতত্ত্ব বিভাগের। কিন্তু তারা সেই কাজ না করে রক্ত পরীক্ষা করা শুরু করে।”

দৈনিক পরীক্ষা হবে এক লাখ নমুনা

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ বেনারকে বলেন, “আমাদের দেশে করোনাভাইরাস পরীক্ষার সংখ্যা নিয়ে সমালোচনা আছে। চীনা চিকিৎসা দলও পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানোর কথা বলেছেন। আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় করোনাভাইরাস পরীক্ষাগার স্থাপন করব।”

তাঁর মতে, বর্তমানে প্রচলিত পলিমারাইজ চেইন রিয়্যাকশন (পিসিআর) পদ্ধতির মাধ্যমে করোনাভাইরাস শনাক্তকরণ সময়সাপেক্ষ। সে কারণে অন্য একটি পদ্ধতির মাধ্যমে করোনাভাইরাস পরীক্ষার বিষয়টি প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে দেয়া হবে।

“আগামী সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে আমরা প্রতিদিন এক লাখ পরীক্ষা করার লক্ষ্য ঠিক করেছি,” বলেন ডা. আবুল কালাম আজাদ।

দেশে বর্তমানে মূলত পিসিআর পদ্ধতিতে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হয় বলে বেনারকে জানান রোগতত্ত্ব বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন।

“এই পদ্ধতিতে (পিসিআর) করোনাভাইরাস পরীক্ষা করতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে। সেকারণে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো যাচ্ছে না,” বলেন আলমগীর হোসেন।

তিনি বলেন, “করোনাভাইরাস নিশ্চিত করার আরেকটি পদ্ধতি হলো জিন এক্সপার্ট সেফেইড পরীক্ষা। এই পদ্ধতিতে ৪৫ মিনিটে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা সম্ভব হবে।”

এই পদ্ধতিতে পরীক্ষার জন্য সারা দেশে ১৩০টি মেশিন আছে জানিয়ে তিনি বলেন, এগুলো যক্ষ্মা রোগ নির্ণয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়। এতদিন এই মেশিন ব্যবহার করা যায়নি।

“কারণ এই পরীক্ষার জন্য একটি কার্টিজ প্রয়োজন হয় যেগুলো যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আর কোথাও প্রস্তুত হয় না। কোভিড পরিস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ওই কার্টিজ রপ্তানি বন্ধ করেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি আবার রপ্তানি শুরু করেছে, আমরাও এটা আমদানি করতে পারব,” জানান ওই কর্মকর্তা।

মার্চ মাসের ‍শুরুর দিকে একশ থেকে ১৫০ জনের নমুনা পরীক্ষা করত রোগতত্ত্ব বিভাগ। তবে ধীরে ধীরে পরীক্ষার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হলেও তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

বর্তমানে ৬০টি পরীক্ষাগারে দিনে গড়ে ১৫ হাজার নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ১৭ জুন সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ৫২৭টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। নমুনার আকারে তফাত থাকলেও পরীক্ষা করা নমুনার মধ্যে গড়ে শতকরা ২২ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হচ্ছেন।

গত ২৪ ঘন্টায় ১৫ হাজার ৫৫৫টি পরীক্ষা করা নমুনার মধ্যে তিন হাজার ৪৮০ জনকে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে বলে সোমবার অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতানা।

তিনি জানান, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে নিশ্চিত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এক লাখ ১৫ হাজার ৭৮৬।

এ ছাড়া গত ২৪ ঘন্টায় আরও ৩৮ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে জানিয়ে নাসিমা সুলতানা বলেন, বাংলাদেশে ১৮ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত এক হাজার ৫০২ জন করোনাভাইরাসে প্রাণ হারিয়েছেন।

অধ্যাপক ইহতেশামুল হক চৌধুরীর মতে, ফেব্রুয়ারির দিকে দেশের প্রতিটি জেলায় করোনভাইরাস পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হলে ৬৪ জেলায় প্রতি দিনে এক হাজার পরীক্ষা করা যেত। তাহলে আরও ভালোভাবে করোনাভাইরাস মোকাবিলা করা যেত।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মোট ৯০ লাখ ৮ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন চার লাখ ৬৯ হাজারের বেশি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন