Follow us

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি দীর্ঘায়িত হতে পারে

পুলক ঘটক
ঢাকা
2020-06-18
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইন। ১০ জুন ২০২০।
ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইন। ১০ জুন ২০২০।
[বেনারনিউজ]

নতুন করে আরও তিন হাজার ৮৩ জন আক্রান্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে সংক্রমিতের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে বৃহস্পতিবার। চব্বিশ ঘণ্টায় মারা গেছেন আরও ৩৮ জন।

“আগামী দুই-তিনমাসের মধ্যে দেশ কোভিড-১৯ মুক্ত হবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, এমনকি দুই-তিনবছর বা তারও বেশি সময় এই ভাইরাস থেকে যেতে পারে,” অনলাইন ব্রিফিং-এ বৃহস্পতিবার জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ।

“দেশে এখন করোনাভাইরাস শনাক্ত রোগীর সংখ্যা একলাখ দুই হাজার ২৯২ জন এবং মৃতের সংখ্যা এক হাজার ৩৪৩ জন,” কোভিড-১৯ পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত বুলেটিনে বলেন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা।

এ মাসের শুরু থেকে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা খুব দ্রুত করোনাভাইরাসের প্রবণতা নিম্নমুখী হবার আশা দেখছেন না, যদি না এর মধ্যেই কোনো কার্যকর টিকা আবিষ্কার হয়ে যায়।

“বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে মানুষ এখন এই ভাইরাস বহন করছে। সে কারণে শনাক্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে,” বেনারকে বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ।

তিনি বলেন, “আমরা একটা ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছি। এই হারে আক্রান্ত হতে থাকলে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলো সামাল দিতে পারবে না। রোগীরা রাস্তায় বা অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যাবেন। তাই আমাদের রোগ প্রতিরোধে বেশি মনোযোগী হতে হবে। প্রত্যেকের নিজের ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি।”

গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনের উহান প্রদেশ থেকে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হন গত ৮ মার্চ। এর দশদিন পর ১৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম কোনো ব্যক্তির এই রোগে মৃত্যু হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মোট ৮৪ লাখ ১৯ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন চার লাখ ৫১ হাজারের বেশি। আক্রান্তের সংখ্যা বিবেচনায় বিশ্বে বাংলাদেশর অবস্থান এখন ১৭ তম।

দীর্ঘায়িত হবে করোনার উপস্থিতি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ নিজেও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

বৃহস্পতিবার নিয়মিত বুলেটিনে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে সবকিছু খুলে দেওয়া ছাড়া সরকারের আর কোনো বিকল্প নেই। কারণ দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখলে তা জনগণের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তিনি বলেন, “সরকারকে জীবন ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয় - অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা করোনাভাইরাসের উপস্থিতি এক-দুই মাস বা তিনমাসেও শেষ হবে না।”

“এটি থাকবে দুই বা তিনবছর পর্যন্ত। যদিও ওই সময় সংক্রমণের তীব্রতা হয়তো এত বেশি থাকবে না,” বলেন আবুল কালাম আজাদ।

তবে, তাঁর কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন প্রখ্যাত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ রশিদ-ই-মাহবুব। তিনি বেনারকে বলেন, “এত দীর্ঘ সময় করোনাভাইরাস সক্রিয় থাকবে এটা বলা বোধ হয় ঠিক হলো না। এটা নির্ভর করবে, পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে তার ওপর। প্রধানত ভ্যাক্সিন এবং বাংলাদেশের ঘরে ঘরে এর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর ভাইরাসের টিকে থাকা নির্ভরশীল।”

“সংক্রমণের ধারা এমনই থাকবে, যদি আমরা বিস্তার রোধ করতে চাই তাহলে এই ধারাটাকে ভেঙে দিতে হবে। সে কারণেই নির্ধারিত জায়গায় লকডাউন জরুরি। পাড়া-মহল্লা কেন্দ্রিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তাহলে বাড়বে, যদিও তা হার্ড ইমিউনিটি নয়,” তিনি বলেন।

বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে রোহিঙ্গা শিবির

ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে তমব্রু শূন্যরেখার রোহিঙ্গা শিবির পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া কক্সবাজার রোহিঙ্গা শিবিরে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে আশ্রয়হীন শতাধিক পরিবারকে অন্যত্র নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইসচিআর) মুখপাত্র মোস্তফা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আশ্রয়হীন ১২০টি পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসতি করা রোহিঙ্গাদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে, দুর্ঘটনা এড়াতে তাঁদের সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে।”

বৃষ্টিতে ভাঙা ঘরবাড়ি মেরামতের কাজ চলছে বলে বেনারকে জানান বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মাহাবুব আলম তালুকদার।

তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। যারা এখনো অতি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে রয়েছেন তাঁদের তালিকা তৈরি করে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”

এখন পর্যন্ত ৩৯ জন রোহিঙ্গাসহ কক্সবাজারে মোট এক হাজার ৭৬৯ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে বেনারকে জানান জেলার সিভিল সার্জন ডাঃ মাহবুবুর রহমান।

তিনি জানান, এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে মারা গেছেন তিনজন রোহিঙ্গা।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর নির্যাতনের ফলে ২০১৭ সালে ২৫ আগস্টের পরে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন।

এর আগেও রাখাইনে বিভিন্ন সময়ের সংহিংসতায় বাংলাদেশে এসেছেন কয়েক লাখ রোহিঙ্গ।

সব মিলে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে বর্তমানে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। এর বাইরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে তমব্রু শূন্যরেখায় আরও একটি রোহিঙ্গা শিবির রয়েছে।

প্রতিবেদনে তথ‍্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কক্সবাজার থেকে আবদুর রহমান।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন