Follow us

অশ্লীল সাইট আটকানোর নামে ব্লগ বন্ধ করে দিয়েছে সরকার

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2019-02-27
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকায় মৌলবাদীদের হাতে মুক্তমনা ব্লগার হত্যার প্রতিবাদে মিছিল। ৮ আগস্ট ২০১৫।
ঢাকায় মৌলবাদীদের হাতে মুক্তমনা ব্লগার হত্যার প্রতিবাদে মিছিল। ৮ আগস্ট ২০১৫।
[এএফপি]

শিশুদের জন্য ভার্চুয়াল জগত নিরাপদ রাখতে জুয়া ও পর্ন সাইট বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, এরই মধ্যে ২০ হাজার সাইট বন্ধ হয়ে গেছে।

ইউটিউবে বিতর্কিত ভিডিও আপলোড করলেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে দুজন সেলিব্রিটিকে ডেকে সতর্কও করা হয়েছে।

তবে জুয়া ও পর্ন সাইট বন্ধের পাশাপাশি একই সময়ে সামহোয়্যারইন ব্লগের মতো জনপ্রিয় ব্লগ বন্ধ করে দেওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ব্লগটির আড়াই লাখ নিবন্ধিত ব্লগার রয়েছে।

এ নিয়ে ইন্টারনেট নজরদারিতে যুক্ত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা (বিটিআরসি) ও পুলিশ কারও কাছ থেকেই সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না।

“টেকনিক্যাল বডি হিসেবে নির্দেশ পেয়ে আমরা ব্লগটি বন্ধ করেছি,” বলে বিটিআরসির জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মো. জাকির খান বেনারকে জানালেও কার কাছ থেকে নির্দেশ পেয়েছেন সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

তবে তথ্য ও যোগযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার লিখিত বিবৃতিতে গত সপ্তাহে ২০ হাজার সাইট বন্ধের যে ঘোষণা দেন, সেগুলোর মধ্যে সামহোয়্যারইন রয়েছে।

২০০৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিনে ব্লগটির যাত্রা শুরু। সূচনা লগ্ন থেকে এর অধিকাংশ ব্লগার সে সময়কার মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া যুদ্ধাপরাধীদের অবস্থানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর ব্লগ লিখেছেন। এমনকি সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যখন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের শিকার হয় তখনও সোচ্চার ছিল ব্লগটি।

কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ না দেখিয়ে সামহোয়্যারইন ব্লগ করে বন্ধ করে দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। ব্লগের ৩৩ জন লেখক এ নিয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, সামহোয়্যারইন ব্লগের মতো যেসব মঞ্চ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ এবং জ্ঞান ও যুক্তির চর্চাকে সমুন্নত রাখতে চায়, তাদের হয়তো ভবিষ্যতে কালো তালিকাভুক্ত হয়ে ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা আছে।

“সামহোয়্যারইনের অবদানকে যেখানে স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন জানানো দরকার, সেখানে বিটিআরসি কেন এবং কোন উৎস হতে তথ্য পেয়ে এই প্ল্যাটফর্মটিকে অশ্লীল হিসেবে চিহ্নিত করেছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একটি দেশীয় ব্লগসাইট যা বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষা-ভাষীদের কাছে জনপ্রিয়, তার বিরুদ্ধে এমন সিদ্ধান্তের পেছনে কারো ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা আক্রোশ কাজ করছে কিনা তাও উন্মোচন হওয়া আবশ্যক,” বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

যেভাবে শুরু

২০১৬ সালের নভেম্বরে হাইকোর্ট পর্নগ্রাফি প্রচার করে এমন ওয়েবসাইটগুলো বন্ধের নির্দেশ দেয়। সে সময় ৫শ সাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তৃতীয় দফা সরকার গঠনের পর আবারও পর্ন সাইটের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে আওয়ামী লীগ সরকার।

সম্প্রতি অশ্লীল ভিডিও তৈরির দায়ে ইউটিউবে আপ লোড করা ভাদাইম্যা চয়েসের অভিনেতা, চ্যানেলের অ্যাডমিন ও মালিকসহ তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সাইবার অপরাধ দমন ইউনিট।

সাইবার অপরাধ দমন ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার নাজমুল ইসলাম বলেন, “অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অপরাধ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

এই অভিযানের যৌক্তিকতা প্রকাশ করে তথ্য ও যোগযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার এক লিখিত বিবৃতিতে জানান, ইন্টারনেট এখন শ্বাস প্রশ্বাসের মতো অতি প্রয়োজন। শিশুদের জন্য ইন্টারনেট নিরাপদ রাখতে সাইবার নিরাপত্তা কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

“দ্রুত গতির ইন্টারনেটের পাশাপাশি ইন্টারনেট নিরাপত্তা অপরিহার্য। শিশুদের ইন্টারনেটে আসতে বলছি, ইন্টারনেট ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করছি কারণ ইন্টারনেট হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জ্ঞানভাণ্ডার। সকলে সচেতন থাকলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কেউ খারাপভাবে ব্যবহার করতে পারবে না,” মোস্তফা জব্বার বলেন।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শেফায়েত হোসেন জানান, বিভিন্ন অংশিজনের সমন্বয়ে একটি টিম গঠন করা হয়েছে। তাঁরা সাইবার মনিটরিং এর কাজ করছেন।

“তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, পুলিশের সাইবার অপরাধ দমন বিভাগ, জাতীয় টেলিযোগাযোগ নজরদারি সংস্থা ও জাতীয় টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা একসঙ্গে কাজটি করছে,” শেফায়েত হোসেন বেনারকে বলেন।

ডেকে সতর্ক করা হচ্ছে

এ দফায় প্রথমে সাইবার অপরাধ দমন বিভাগ গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সানাই মাহবুব নামে একজন অভিনেত্রীকে ডেকে পাঠায়। কয়েক ঘন্টার জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তিনি ফেসবুকে তাঁর আপলোড করা বিতর্কিত ভিডিওগুলো সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

এর একদিন পর সাইবার অপরাধ দমন বিভাগে ডেকে পাঠানো হয় জনপ্রিয় ইউটিউবার সালমান মুক্তাদিরকে। চার ঘন্টা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার পর তিনি বেনারকে বলেন, অভদ্র প্রেম নিয়ে তাঁর যে ভিডিওটির সমালোচনা হচ্ছিল সেটি তিনি আগেই নামিয়ে নিয়েছেন। এ নিয়ে এত আলোচনার কারণ তিনি বুঝতে পারছেন না।

“দেখুন বিষয়টি নিয়ে যা হয়েছে, তাতে আমার নিজেকে একজন সন্ত্রাসী মনে হচ্ছিল। সংবাদ মাধ্যম হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। আমি ভিডিওটি আগেই রিমুভ করেছিলাম,” সালমান বেনারকে বলেন।

পরে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে সালমান জানান শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে সরকারের যে উদ্যোগ তিনি তা এগিয়ে নিতে চান।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন