Follow us

চারদিনের ব্যবধানে অনুমোদনহীন দুটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ২৯ জনের মৃত্যু

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2019-12-16
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
গাজীপুরের লাক্সারি স্মার্ট এনার্জি সেভিং ফ্যান লিমিটেড কারখানায় আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন একজন দমকল কর্মী। ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯।
গাজীপুরের লাক্সারি স্মার্ট এনার্জি সেভিং ফ্যান লিমিটেড কারখানায় আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন একজন দমকল কর্মী। ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯।
[নিউজরুম ফটো]

চার দিনের ব্যবধানে ঢাকার কাছে কেরানীগঞ্জ ও পাশের জেলা গাজীপুরের দুটি কারখানায় আগুনে পুড়ে মোট ২৯ জন নিহত হয়েছেন। অগ্নিকাণ্ডের পরপরই সরকারি কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছেন, কারখানা দুটির অনুমোদন ছিল না।

তবে অননুমোদিত কারখানা কী করে চলছিল তার কোনো জবাব কর্তৃপক্ষ দিচ্ছে না।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (নিরাপত্তা) মো. কামরুল হাসান বলেছেন, তদন্ত হচ্ছে। এর চেয়ে বেশি কিছু তিনি বলতে চাননি।

“কেরানীগঞ্জের ঘটনা তদন্তে শ্রম মমন্ত্রণালয় ও ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স আলাদা তদন্ত কমিটি করেছে। প্রতিবেদন আগামী সোমবার জমা হওয়ার কথা রয়েছে। গাজীপুরের ফ্যান ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে,” কামরুল হাসান বেনারনিউজকে বলেন।

উল্লেখ্য গত বুধবার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ায় প্রাইম পেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজে আগুন ধরে যায়। গুরুতর দগ্ধ ৩১ জনকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়। পরে ২২ জনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। এখন পর্যন্ত ওই ঘটনায় ১৯ জন মারা যান। দুজন বাদে বাকি সবাই মারা যান চিকিৎসাধীন অবস্থায়।

অন্যদিকে রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকে গাজীপুরের রওজা লাক্সারি ফ্যান কারখানায় আগুন লাগে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে। কারখানার ভেতরেই পাওয়া যায় অগ্নিদগ্ধ ১০টি মৃতদেহ। ওই ঘটনায় আহত দুজন শহীদ তাজউদ্দীন সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

দুটি ঘটনাতেই এমনভাবে দগ্ধ হয়েছেন শ্রমিকেরা যে তাঁদের স্বজনরাও চিনতে পারছেন না।

গতকাল সোমবার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউএর সামনে কথা হচ্ছিল চম্পা বেগমের সঙ্গে। তাঁর দেবর সুজন কেরানীগঞ্জের আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। কৃত্রিম শ্বাস–প্রশ্বাসে বেঁচে আছেন স্বামী সোহাগ। ছয় বছরের মেয়ে সোহাগীকে বাবার কাছে নিয়ে যাওয়ার সাহস পাননি।

“দিনে একবার ডাক্তারের অনুমতি নিয়ে আমি ভেতরে যাই, মেয়েরে নিই না। ডাক্তাররাই নিষেধ করে,” চম্পা বেগম বেনারনিউজকে বলেন। জামালপুর থেকে আসা আফসানা বেগম আগুনে পোড়া সারি সারি রোগীর মধ্য থেকে প্রথম দেখায় ছেলেকে চিনতে পারেননি।

“ছেলে নিজেই বলছে মা এই যে আমি এখানে, তোমার সোহান,” আফরোজা বলেন। অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পরদিন ওই একটি বাক্যই বলে সোহান, এরপর আর কোনো কথা বলতে পারেনি।

দুর্ঘটনার পর জানা গেল অনুমোদন নেই

কেরানীগঞ্জে অগ্নিকাণ্ডের পরপরই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এবং কেরানীগঞ্জের সাংসদ নসরুল হামিদ বিপু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিদগ্ধদের দেখতে যান। সেখানেই তিনি মন্তব্য করেন, কারখানাটি ছিল অননুমোদিত।

“আমরা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে কলকারখানা স্থাপনের কথা বলছি। এই কারখানাটিরও অনুমোদন ছিল না। তারপরও চলছিল,” নসরুল হামিদ বিপু সাংবাদিকদের বলেন।

গতকাল সোমবার অগ্নিদগ্ধ বন্ধুকে দেখতে বার্ন ইনস্টিটিউটে এসেছিলেন মো. হৃদয়। গত মাসে এই কারখানার চাকরি ছেড়ে তিনি অন্যটিতে যোগ দেন। তিনি বলেন, এর আগেও কারখানায় আগুন লেগেছে।

“এ বছরের শুরুর দিকে একবার আগুন লেগেছিল কারখানায়। সে সময় মালপত্র পুড়ে গিয়েছিল। হতাহত ছিল না। এর আগেও এই কারখানায় আগুন লাগে। তারপরও শুধরানোর কোনো চেষ্টা করেনি,” হৃদয়ে বেনারকে বলেন।

অন্যদিকে গতকাল সোমবার কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম মহাপরিচালক ফরিদ আহমেদ বলেন, গাজীপুরের রওজা লাক্সারি ফ্যান ফ্যাক্টরিটি চলছিল কোনো রকম অনুমোদন ছাড়াই।

“স্থানীয় একটি আবাসিক ভবনের দোতলার ওপর টিন শেড দিয়ে কারখানাটি তোলা হয়। তৃতীয় তলার দরজার কাছে দাহ্য পদার্থ থেকে আগুন লাগে। নিচে নামার জন্য কারখানাটিতে বিকল্প কোনো সিঁড়ি ছিল না,” ফরিদ আহমেদ বলেন।

তিনি আরও বলেন, তখন কারখানায় ১৯ জন কাজ করছিলেন। আগুনের ভেতর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে নয়জন বেরিয়ে আসেন। বাকিরা কক্ষের ভেতর আটকা পড়েন। তাঁরা আর বাঁচেননি।

এদিকে ফায়ার সার্ভিস গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক মো. মামুন অর রশিদ বলেন, “কারখানাটির কোনো ফায়ার লাইসেন্স ও অগ্নিনির্বাপণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ছিল না।”

একটি ঘটনায় মামলা, অন্যটিতে প্রস্তুতি

কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় থানায় ‘পরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে গুরুতর জখমসহ হত্যা’ করার অপরাধে মামলা করেছেন মো. জাহাঙ্গীর। জাহাঙ্গীরের দুই ভাই আলম ও রাজ্জাক দুজনই আগুনে শতভাগ পুড়ে যান। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁরা নিহত হন।

ওই মামলায় আসামি করা হয়েছে, প্রাইম পেট ও প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক নজরুল ইসলামকে। তবে চার দিন পরও মালিককে গ্রেপ্তারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি পুলিশ।

পুলিশ পরিদর্শক মো. আসিকুজ্জামান মামলাটির তদন্ত করছেন।

“আমরা আসামি ধরার চেষ্টা করছি। আপাতত বলার মতো অগ্রগতি নেই,” আসিকুজ্জামান বেনারনিউজকে বলেন।

অন্যদিকে গাজীপুরে কারখানায় আগুন লাগা ও ১০ জনের মৃত্যুতে গতকাল রাত পর্যন্ত মামলা হয়নি। জয়দেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাবেদ আলী জানান, মামলার প্রস্তুতি চলছিল।

স্থানীয় সাংবাদিকেরা বলছেন, রওজা লাক্সারি ফ্যান কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদ হোসেন ঢালি টাকা-পয়সা দিয়ে মিটমাটের চেষ্টা করছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে এবং তাঁরা যে উৎসব বোনাস ও বেতন পেতেন তাঁদের পোষ্যদের আজীবন সেই সুবিধা দেওয়া হবে। অনুমোদন ছাড়া কারখানা চালাচ্ছিলেন কেন এমন প্রশ্ন করতেই তিনি সটকে পড়েন।

সরকারকে কঠোর হওয়ার আহ্বান

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেহেদী হাসান আনসারী সরকারকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এফ আর টাওয়ারসহ বেশ কিছু ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা খতিয়ে দেখেছে যে কমিটিগুলো সেগুলোর সদস্য ছিলেন বুয়েটের এই শিক্ষক।

“দেখুন, কোথাও আগুন লাগলেই কারখানার অনুমোদন নেই, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এমন কথা আমরা শুনি। চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পর ঢাকার সহস্রাধিক ভবনের ত্রুটি শনাক্ত হয়। তারপর আর ত্রুটি সারানোর ব্যবস্থা নেওয়া হলো না,” মেহেদী হাসান আনসারী বেনারনিউজকে বলেন।

তিনি বলেন, রানা প্লাজা ধস ও তাজরিনে অগ্নিকাণ্ডের পর বিদেশি ক্রেতাদের চাপে পড়ে কারখানাগুলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্য হয়েছে। চাপ দিলেই কারখানাগুলো মানতে বাধ্য। দুর্ঘটনা রোধে সরকারকে শক্ত হতেই হবে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন