Follow us

কেরানীগঞ্জে প্লাস্টিক কারখানায় ভয়াবহ আগুন, নিহত ১৩

পুলক ঘটক
ঢাকা
2019-12-12
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কেরানীগঞ্জে প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরির কারখানায় আগুনে দগ্ধ হয়ে মৃতদের মরদেহ নিতে এসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। ১২ ডিসেম্বর ২০১৯।
কেরানীগঞ্জে প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরির কারখানায় আগুনে দগ্ধ হয়ে মৃতদের মরদেহ নিতে এসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। ১২ ডিসেম্বর ২০১৯।
[নিউজরুম ফটো]

ঢাকার কেরানীগঞ্জে প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরির কারখানায় আগুনে দগ্ধ হয়ে ১৩ জন শ্রমিকের করুণ মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর দগ্ধ আরও ১৯ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। বার্ন ইউনিটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তাহমিনা সাত্তার শিমু বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকায় প্রাইম পেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কারখানায় আগুনের ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই একজন প্রাণ হারান। মেডিকেলে নেওয়ার পথে এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার রাতে ৯ জন ও বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু ঘটে।

ডা. তাহমিনা সাত্তার বেনারকে বলেছেন, “আহতদের অবস্থা ভালো নয়। এদের কারও কারও শরীরের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পুড়ে গেছে। শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ায় প্রায় সবাই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।”

দগ্ধদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের অধ্যাপক ডা. বিধান সরকারকে প্রধান করে ১২ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।

গ্যাসের পাইপের লিকেজ থেকে এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল বলে ধারণা করছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য এবং ক্ষতির পরিমাণ জানতে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

অপর একটি তদন্ত কমিটি করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোল্লা জালাল উদ্দিনকে প্রধান করে গঠিত পাঁচ সদস্যের ওই কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

ওই এলাকায় বিগত বছরে কতগুলো প্লাস্টিক কারখানা সরকারি কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেছেন, সেসব পরিদর্শন প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়েছে কিনা এবং না হয়ে থাকলে তার কারণ নির্ধারণ করতে কমিটিকে বলা হয়েছে। ওই এলাকার প্লাস্টিক কারখানাগুলোর ঝুঁকি নির্ধারণে এবং ঝুঁকি নিরসনের সুপারিশ দিতেও তদন্ত কমিটিকে দায়িত্ব প্রদান করে মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

স্বজনদের আহাজারি

ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের বারান্দায় বিলাপ করছিল ১০/১১ বছরের শিশু সিফাত। তার মামা ফয়সাল এমনভাবে পুড়ে গেছেন যে মৃতদেহ দেখে চিনতে পারছিল না বলে সে জানায়।

“এই মামার কাছেই আমি থাকতাম। মামাই আমাকে এত দিন দেখাশোনা করেছে,” বেনারকে বলেছে সিফাত।

বিক্রমপুরের হানিফ দেওয়ান এবং ফাতেমা বেগমের একমাত্র ছেলে ফয়সাল ওই কারখানায় প্রধান বৈদ্যুতিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

“এক বছর দুই মাস আগে ছেলের বিয়ে দিয়েছি। বউটা অন্তঃসত্ত্বা। সন্তান দেখার আগেই বাবা আমার বিদায় নিল,” এ কথা বলেই ডুকরে কেঁদে ওঠেন হানিফ। তার স্ত্রী ফাতেমা বেগম ক্ষণে ক্ষণে মূর্ছা যাচ্ছেন।

দুর্ঘটনায় আহত হওয়ায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মারা গেছেন আপন দুই ভাই রাজ্জাক ও আলম। বড় ভাই রাজ্জাক মারা যান সকাল সাড়ে ৬টায়। ছোট ভাই আলম মারা যান দুপুর একটায়। তাঁদের সন্তান ও আত্মীয় পরিজনের কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

কারখানার সিকিউরিটি কর্মকর্তা বাহার আলী বেনারকে বলেন, “ওই কারখানার ধ্বংসস্তূপ থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বুধবার একজনের পোড়া দেহ উদ্ধার করেছিল। তাঁর নাম জাকির হোসেন, বয়স ২২।”

বুধবার সন্ধ্যা থেকে হাসপাতালের মর্গে পড়েছিল একটি মৃতদেহ। মুখাবয়ব এমনভাবে পুড়েছিল যে সহকর্মীরা তাঁকে শনাক্ত করতে পারেননি। অবশেষে বৃহস্পতিবার তাঁর বাবা গুলজার হোসেন ছেলের হাতের ব্রেসলেট দেখে তাঁকে চিনতে পারেন। ছেলের নাম মাহবুব।

“বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে মাহবুবকে ফোন দিচ্ছি, রিং বাজে কিন্তু কেউ ধরে না। রাতে আমার এক ভাতিজা ফোন দিয়ে বলল, ছেলে যে কারখানায় কাজ করত সেখানে আগুন লেগেছে। রাতেই মেডিকেলে এসেছি। সেখানে ভর্তি ৩১ জনের নামের তালিকা দেখে প্রত্যেকের কাছে গেছি। কিন্তু আমার ছেলে ছিল না।”

“আজ সকালে জানলাম মর্গে একটি লাশ আছে। মর্গে গিয়ে দেখলাম লাশের পুরোটাই পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। বাম হাতে একটা ব্রেসলেটটা ছিল, সেটা দেখেই বুঝলাম আমার ছেলে,” বলেন গুলজার।

গুলজার পেশায় রিকশা চালক। দুপুর একটা পর্যন্ত মরদেহ নেওয়ার জন্য মেডিকেলের মর্গের সামনে ঘোরাঘুরি করছিলেন তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, “লাশ এখনো দেয় নাই। ময়নাতদন্তের পর দেবে বলেছে।”

অনুমোদনহীন কারখানা

প্রাইম পেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামক ওই কারখানাটিতে ওয়ান টাইম প্লেট, কাপসহ প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করা হতো। কোম্পানির মালিকের নজরুল ইসলাম, ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক আছে্ন। বৃহস্পতিবার কারাখানার মালিকসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে স্থানীয় থানা পুলিশ।

কারখানার সিকিউরিটি কর্মকর্তা বাহার আলী বেনারকে বলেন, “বাক্স তৈরির ইউনিটে প্রথম আগুন লাগে। আগুনে কারখানার ম্যানেজার নজরুল ইসলামসহ ৩০ জন দগ্ধ হন।”

আহত শ্রমিক জাকির হোসেন বেনারকে বলেন, “যে ঘরে আগুন লেগেছিল সেখানে ৮টি গ্যাসের সিলিন্ডার ছিল। আগুন লাগার পর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। কারখানার মধ্যে অগ্নি নির্বাপণ যন্ত্র ছিল। আমরা সেগুলা দিয়ে নেভানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু লাভ হয় নাই।”

“চারদিকে তখন জ্বলজ্বলে আগুন। সবাই দিশেহারা হয়ে ছোটাছুটি ও বের হওয়ার চেষ্টা করছিল,” বলেন জাকির।

জাকির গত চার বছর যাবৎ ১২ হাজার টাকা বেতনে ওই কারখানায় কাজ করতেন বলে জানান। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী কারখানার বিভিন্ন ইউনিটে প্রায় ৩০০ লোক কাজ করত। “দুই শিফটে কাজ চলে। এক শিফটে প্রায় ১৫০ লোক কাজ করে,” বলেন জাকির।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বুধবার রাতে সাংবাদিকদের বলেন, ওই কারখানার কোনো অনুমোদন ছিল না। অনুমোদনহীনভাবে কারখানা গড়ে তোলা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

“আমরা অনেকবার বলেছি, শিল্পকারখানা হবে নির্দিষ্ট জোনে। স্থানীয় সরকার ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে আমি অনেকবার বলেছি। কিন্তু, কারখানাগুলো সরানো যায়নি। কারখানাটিতে ৭০ থেকে ৮০ জন শ্রমিক কাজ করত। এটি খুবই অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা,” বলেন বিপু।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন