Follow us

ঢাকায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি কর্মীদের সংঘর্ষ

পুলক ঘটক
ঢাকা
2018-11-14
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
পুলিশের সাথে সংঘর্ষের সময় ঢাকার নয়া পল্টনে পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় বিএনপি সমর্থকেরা। ১৪ নভেম্বর ২০১৮।
পুলিশের সাথে সংঘর্ষের সময় ঢাকার নয়া পল্টনে পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় বিএনপি সমর্থকেরা। ১৪ নভেম্বর ২০১৮।
[বেনারনিউজ]

আপডেট: ১৪ নভেম্বর, ইস্টার্ন টাইম দুপুর ০১:১

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য বিএনপির মনোনয়নপত্র বিক্রির তৃতীয় দিন বুধবার রাজধানীর নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দলীয় নেতা–কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

ওই সংঘর্ষে পুলিশের ২৩ জন ও বিএনপির অর্ধ শতাধিক আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে উভয়পক্ষ।

পুলিশ মুহুর্মুহু টিয়ারগ্যাস শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে রাস্তায় জড়ো হওয়া কয়েক হাজার বিএনপি নেতা-কর্মীকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। বিএনপি নেতা–কর্মীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে এবং তিনটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

পুলিশের পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেন বেনারকে বলেছেন, “পার্টি অফিসের সামনে আসা নেতা–কর্মীরা সড়ক বন্ধ করে দিয়ে যানবাহন চলাচলে বাধা দিচ্ছিল। পুলিশ তাদের বারবার অনুরোধ করেছে সড়কের এক পাশে সুশৃঙ্খলভাবে অবস্থান নিতে। কিন্তু তারা পুলিশের কাজে বাধা দেয় এবং ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে।”

তিনি বলেন, “আমরা যখন যানজট নিরসনের জন্য দায়িত্ব পালন করছিলাম তখন বিনা কারণে তারা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করেছে।”

দুপুর পৌনে একটা থেকে থেমে থেমে প্রায় তিন ঘণ্টা এই সংঘর্ষ চলে। এই সংঘর্ষের দুপক্ষের ৪৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এতে পুলিশের ২৩ কর্মকর্তা ও সদস্য আহত হন বলে সাংবাদিকদের জানান ডিএমপির উপ-কমিশনার শিবলী নোমান।

এদিকে এই সংঘর্ষে বিএনপির অর্ধ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে বুধবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায় বিএনপি। তবে এর আগে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দলের ২০ জনের আহত হবার কথা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন।

পাল্টাপাল্টি দোষারোপ

নয়াপল্টনের এই সংঘর্ষের ঘটনায় পাল্টাপাল্টি দোষারোপ করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি।

নির্বাচন বানচাল করতেই পুলিশের গাড়িতে বিএনপির নেতা–কর্মীরা হামলা চালিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি পোড়ানোর ঘটনা ‘পরিকল্পিত’।

অন্যদিকে বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই সরকারের বাহিনী এই হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের জন্য বুধবার সকাল ৯ টা থেকে বিএনপির বিভিন্ন নেতা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয় অভিমুখে আসতে থাকেন। সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে স্থাপিত ১০টি বুথে একযোগে এ মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু হয়।

বেলা ১২ টার দিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ও ঢাকার সাবেক মেয়র মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে কয়েক হাজার মানুষের একটি মিছিল কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আসলে রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। পৌনে একটার দিকে পুলিশ বিএনপি কর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিলে শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। এসময় একটি বিকট শব্দ হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পুলিশ এবং বিএনপি উভয় পক্ষই ছিল মারমুখী। সংঘর্ষ শুরুর ১৫/২০ মিনিটের মাথায় পুলিশ পিছু হটে নাইটিঙ্গেল মোড়ের সামনে অবস্থান নেয় এবং জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ছুড়তে থাকে। বিএনপি কার্যালয়ের দিক থেকে নেতা–কর্মীরাও ইটপাটকেল ছুড়ে জবাব দিচ্ছিল।

সংঘর্ষের পর ঘটনাস্থলে এসে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, “নির্বাচন সামনে রেখে ইস্যু তৈরি করার জন্য বিএনপি কর্মীরা বিনা উসকানিতে সংঘর্ষে জড়িয়েছে।

তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলেও বিএনপি নেতা–কর্মীরা তা মানেনি।

সরকারকে দুষছে বিএনপি

পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে ১ টার দিকে তাৎক্ষণিকভাবে একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সমাবেশ করে বিএনপি। এতে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, “সরকারের বাহিনী বিনা উসকানিতে বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা করেছে। নির্বাচন থেকে বিএনপিকে দূরে রাখার জন্য পরিকল্পিতভাবে তারা এই কাজ করেছে।”

সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “সরকারের নির্দেশে পুলিশ বিনা উসকানিতে এই আক্রমণ করেছে। তারপরও আমরা অশান্তির পথে হাঁটব না। সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দেব।”

তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল জোনের উপকমিশনার আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “কোনো প্রকার উসকানি ছাড়াই তারা পুলিশের ওপর হামলা করেছে এবং গাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। আমরা ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি।”

বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী বেনারকে বলেন, “বিএনপির অফিস অভিমুখে জনতার ঢল দেখে সরকারের গায়ে জ্বালা শুরু হয়েছে। এ জন্য হামলা করে জনতাকে দমানোর এই চেষ্টা।”

উদ্দেশ্য নির্বাচন বানচাল: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বুধবার বিকেলে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, “নির্বাচনে ইস্যু তৈরি করার জন্য বিএনপি পরিকল্পিতভাবে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে।”

“নির্বাচন পেছানোর জন্য তারা পরিকল্পিতভাবে পুলিশের ওপর হামলা করে নিজেদের বীরত্ব দেখিয়েছে। বিএনপির কার্যালয়ের সামনে মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে পুলিশের ওপর হামলা হয়েছে, পুলিশের দু’টি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও বলেন, “যখন দেশ একটি সুন্দর নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে, নির্বাচন কমিশন যখন তফসিল ঘোষণা করেছে, দেশের মানুষ যখন একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছে, সেই সময়ে এ ঘটনা পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে।"

“এ হামলা ধূম্রজাল সৃষ্টি করে নির্বাচন বানচালের একটা অপচেষ্টা,” বলেন তিনি।

ইসিতে ঐক্যফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগ

সংসদ নির্বাচন আরও তিন সপ্তাহ পিছিয়ে জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তাঁরা বলেছেন, শেষ পর্যন্ত তাঁদের নির্বাচনে থাকা না-থাকা নির্ভর করবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আচরণের ওপর। বুধবার ইসিতে গিয়ে ঐক্যফ্রন্ট এই দাবি জানায়।

ঐক্যফ্রন্ট এই দাবি জানানোর পরপরই ইসিতে যায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল। আওয়ামী লীগ বলেছে, নির্বাচন আর পেছানো যাবে না।

এই পরিস্থিতিতে ইসি বলেছে, জানুয়ারিতে নির্বাচন করতে হলে তা ইসির জন্য কষ্টকর হবে। তবু বিষয়টি নিয়ে কমিশনের সভায় আলোচনা হবে।

বৈঠক শেষে ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ইসি বলেছে, তারা নির্বাচন পেছানোর দাবি বিবেচনা করবে।

ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বৈঠকের পরপর ইসিতে যায় আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল। বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচ টি ইমাম সাংবাদিকদের বলেন, তাঁরা ইসিকে বলেছেন, এক সপ্তাহ পেছানো হয়েছে। পেছানো হলেই যত বেশি সময় যাবে নয়াপল্টনের ঘটনার মতো ঘটনা ঘটবে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন