Follow us

নির্বাচনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে বিরোধী জোটের ৭৪ মামলা

পুলক ঘটক
ঢাকা
2019-02-14
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার একটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শেষে গণনার জন্য ব্যালট বাকশো নিয়ে যাচ্ছেন নির্বাচনী কর্মকর্তারা। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮।
ঢাকার একটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শেষে গণনার জন্য ব্যালট বাকশো নিয়ে যাচ্ছেন নির্বাচনী কর্মকর্তারা। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮।
[এএফপি]

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে অংশ নেওয়া বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা অবশেষে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। গত দুদিনে তাঁদের ৭৪ প্রার্থী হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলার আবেদন করেছেন। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার ৫৬টি আবেদন দায়ের হয়েছে।

বিএনপির আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বৃহস্পতিবার বেনারকে বলেন, “এসব আবেদনে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন বাতিল করে আবারও ভোটগ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।”

ভোটে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এনেছেন মামলাকারীরা।

সরকার বিরোধী জোটের বাকি প্রার্থীরাও মামলা দায়ের করবেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। কাজল বলেন, “প্রহসনের নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়া এই সরকারের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই এবং রাজনৈতিক লড়াই দুটোই চলমান থাকবে।”

এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রার্থীর অভিযোগ থাকলে তিনি মামলা করতেই পারেন। এ বিষয়ে আমাদের কিছু বলার নেই।”

এর আগে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি দিয়েছিল ঐক্যফ্রন্ট।

১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের বিধান অনুসারে, একজন আবেদনকারী নির্বাচনী মামলায় জয়ী প্রার্থীর নির্বাচন বাতিল, আবেদনকারী বা অন্য কোনো প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা এবং সংশ্লিষ্ট আসনের নির্বাচন বাতিলের আবেদন করতে পারেন।

নির্বাচনের দিন থেকেই বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বলে আসছেন, আগের রাতেই ব্যালট পেপারে সিল মেরে ভোটের বাক্স ভর্তি করা হয়েছে। ভোটের সময় ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের নির্বাচনী এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

ভোটের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীন পুনর্নির্বাচনেরও দাবি জানায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ফ্রন্টের মনোনয়নে নির্বাচিত আট সাংসদ শপথ না নেয়ারও সিদ্ধান্ত নেন। এরই ধারাবাহিকতায় তাঁরা এখন মামলা দায়ের করছেন। তবে বিজয়ী হওয়ার আশা নেই তাঁদের।

তবুও “নির্বাচনের নামে যা ঘটেছে; আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস এবং ভোট ডাকাতির তথ্যপ্রমাণগুলো অন্ততঃ রাষ্ট্রের রেকর্ডে থাকুক- এটাই আমরা চাচ্ছি,” বেনারকে বলেন ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা এবং গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী।

হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইবুনালে আইনজীবী ও প্রার্থী সুব্রতই প্রথম মামলাটি দায়ের করেন। বিএনপি এবং এর শরিক দলের নেতারা জানিয়েছেন, প্রার্থীদের মামলা করার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামলাগুলো পরিচালনাও করা হবে কেন্দ্রীয়ভাবে।

বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, এসব মামলার ফলে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার নৈতিক ভিত্তি আরও দুর্বল হবে। আদালতে তথ্য-প্রমাণ দাখিল করলে ক্ষমতাসীনদের বিজয় দেশে-বিদেশে আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

বিএনপির আইনজীবী কাজল বেনারকে বলেন, “আওয়ামী লীগ এবার কীভাবে ক্ষমতায় গেছে তা তারা নিজেরাও জানে। নির্বাচন ছিল একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। তাদের ক্ষমতায় থাকার কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই। এটাকে আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করা আমাদের দায়িত্ব।”

নির্বাচনের তিন দিন পর ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের ঢাকায় বিএনপির গুলশান অফিসে ডেকে নির্বাচন নিয়ে তাঁদের বিস্তারিত অভিজ্ঞতা শোনা হয়। সেখানেই প্রার্থীরা নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়। একই সময়ে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকেও মামলার দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানানো হয়।

ছয়টি বেঞ্চে শুনানি হবে
নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ছয়টি নির্বাচনী বেঞ্চ গঠন করেছেন প্রধান বিচারপতি। একক বিচারপতির এই বেঞ্চগুলোতে মামলাগুলোর শুনানি হবে। বিএনপির পক্ষ থেকে মামলা পরিচালনা করার জন্য আইনজীবীদের নিয়ে একটি প্যানেল গঠন করা হয়েছে।

ঢাকা বিভাগ ও সিলেটের কিছু অংশের দায়িত্বে রয়েছেন মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, চট্টগ্রামে মীর মো. নাসিরুদ্দিন, বরিশালে জয়নুল আবদিন, খুলনা ও ফরিদপুরে অ্যাড. নিতাই রায় চৌধুরী, ময়মনসিংহে ফজলুর রহমান এবং রংপুরে রাজীব প্রধান।

এই মামলাগুলোয় ভোটের আগে-পরে হামলা এবং গায়েবি মামলাসহ বিভিন্ন আসনে ঘটা সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

“আদালতে এটা প্রমাণ করা সম্ভব যে নির্বাচনের নামে যা হয়েছে, সেটাকে নির্বাচন বলা যাবে না। আমরা সন্ত্রাস, অনিয়ম ও কারচুপি’র উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ আদালতকে দেখাতে পারব,” বলেন কাজল।

তবে ফ্রন্টের শীর্ষ নেতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী বেনারকে বলেন, “ফলাফল কী হবে সেটা তো বোঝাই যায়। কোনো ইতিবাচক ফল হবে না জেনেও মামলা করছি। তারা যেন বলতে না পারে আমরা মামলা করিনি, অভিযোগ করিনি।”

সুব্রত চৌধুরীর ভাষায়, “একটা অভিযোগ করে রাখলাম আরকি।”

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বেনারকে বলেন, “নির্বাচনী বিরোধ সংক্রান্ত মামলা নিয়ে আমাদের অতীত ‘রেকর্ড’ ভালো নয়। এ জন্য অনেকে বিচার পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হতে পারছেন না।”

“এবারের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া দরকার। রায় যেন দ্রুত দেওয়া হয়, আদালতকে সেই উদ্যোগ নিতে হবে,” বলেন তিনি।

মামলা জিতে সংসদে দুজন
নির্বাচনে পরাজয়ের পর মামলা করে অতীতে বিরোধী দলের কেউ সংসদে বসতে পেরেছেন, এমন নজির খুব বেশি নেই বলে জানিয়েছেন সুব্রত চৌধুরী। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলের বিরুদ্ধে মামলা করে সংসদে বসেছেন দুজন।

একজন ন্যাপ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং অপরজন বিএনপির মাহমুদুল হাসান।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করে মামলাটি করে জয়ী হয়েছিলেন। এরপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৫ আসনে বিএনপি নেতা মাহমুদুল হাসান হারার পর মামলা করে জয়ী হন এবং সংসদে যান।

আরও কয়েকটি মামলার ফয়সালা হলেও সংসদে যেতে পারেননি মামলাকারী। তবে অধিকাংশ মামলা নিষ্পত্তির আগেই সংশ্লিষ্ট সংসদের মেয়াদ পেরিয়ে গিয়েছে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন